বিসিএসে টিকেও যোগ দিতে পারেননি ঢাবি’র মেধাবী ছাত্র মাগুরার সোহান


ছোট্ট সোহানের মেধা দেখে স্কুলশিক্ষক বলেছিলেন, ‘তোকে দিয়ে সবই সম্ভব।’ শিক্ষকের সেই কথা মনে গেঁথে রেখেছিলেন সোহান। পড়াশোনা করেন সেভাবেই। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির পর স্কুল-কলেজ জীবনে  কোনো পরীক্ষায় সেকেন্ড হননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষে অংশ নেন ২৭তম পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিসিএস) পরীক্ষায়। টিকেও যান। মেধা তালিকায় ২০০ জনের মধ্যে নামও চলে আসে। নিয়োগ পান সমবায় ক্যাডারে। সেই অনুযায়ী তার স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়। কিন্তু যোগ দিতে পারেননি চাকরিতে। তার অপরাধ
– তিনি একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তৎকালীন ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকার তার বিরুদ্ধে দায়ের করে মামলা। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। রায়ও পক্ষে পেয়ে যান তিনি। কিন্তু ২০০৯ সালে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এরপর আটকে যায় সোহানের বিসিএসে যোগদান।
বাবা মো. আবদুল আজিজ চাকরি করতেন পুলিশে। পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবার চাকরির সুবাদে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন খুলনায়। প্রাথমিক সব পরীক্ষায় রাখেন মেধার স্বাক্ষর। ৯৪ সালে অংশ নেন এসএসসি পরীক্ষায়। ওই বছর যশোর বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ মার্ক পেয়ে মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। এরপর ভর্তি হন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে। ’৯৬ সালে ওই কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। মানবিক বিভাগ থেকে ৭৮৭ মার্ক পেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জন করেন। এরপর চলে আসেন রাজধানীতে। অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। টিকেও যান। ৯৭-৯৮ সেশনে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে ভর্তি হন। ঢাবিতে পা রেখেই নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন। জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। যোগ দেন ছাত্রদলে। তবে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাননি। রাজনীতির পাশাপাশি সমানতালেই চালিয়ে যান পড়াশোনা। অনার্সের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত ক্লাসে প্রথম স্থান ধরে রাখেন। তৃতীয় বর্ষে উঠেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিহিংসার শিকার হন। তাকে ছাড়তে হয় আবাসিক হল। তবে নিয়মিত অংশ নিতেন ক্লাস পরীক্ষায়। ২০০০ সালে হঠাৎ একমাত্র উপার্জক্ষম বাবা মারা যান। ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে পড়েন অথৈ সাগরে। তবে সংসারের হাল ধরেন গৃহিণী মা। বাবার মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়েননি। বড় সন্তান হিসেবে সান্ত্বনা দেন ছোট ভাই-বোনদের। পড়াশোনাও চালিয়ে যান। সেশন জটের কারণে ২০০২ সালের অনার্স পরীক্ষা হয় তিন বছর পর। অনার্সে পান প্রথম শ্রেণী। এরপর অংশ নেন ২৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়। টিকেও যান সোহান। এরপর লিখিত পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। মৌখিক পরীক্ষায় উতরে যান তিনি। পান সমবায় ক্যাডার। সেই অনুযায়ী ২০০৭ সালের ৪ঠা মার্চ তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্মারক নং- স্বাঃঅধিঃ/হাসঃ/মেঃ বোর্ড/বিসিএস-২৭/০৭/৬৭৬(৩৫৬৬)। রোল নং-০০১৮৬২। ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সংঘর্ষের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। এরপর রায়ও পেয়ে যান তিনি। তবে ২০০৯ সালের মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে করা হয় একের পর এক মামলা। এতে আটকে যায় সোহানের চাকরিতে যোগ দেয়া। তবে ছাত্রদলের সর্বশেষ ঘোষিত কমিটিতে সহ-সভাপতির  দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। এরপর তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৩টি মামলা করা হয়। চাকরিতে যোগ দিতে না পারার আক্ষেপ করে সোহান মানবজমিনকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার স্বপ্ন ছিল, ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে। বাবা-মার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই পড়াশোনা করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতেই রাজনীতির পোকা মাথায় ঢুকে। তবে পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটাইনি। মেধাবী এই ছাত্রনেতা বলেন, দিনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করলেও রাতে পড়াশোনা করতাম। হলের মধ্যে আমি রাতে সবসময় সবার শেষে ঘুমোতে যেতাম। হলের কোনো রুমে যদি আলো জ্বালানো থাকতো, আমি ঘুমাতে যেতাম না। এছাড়া বন্ধুদের কাছ থেকে নোট সংগ্রহ করতাম। নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষায়ও অংশ নিতাম। বিসিএসে টিকলেও মামলার কারণে চাকরিতে যোগ দিতে পারিনি। মায়ের স্বপ্নও ভেঙে যায়। ফলে পরবর্তীকালে আর কোনো চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেইনি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণে সান্ধ্যকালীন কোর্সে মাস্টার্সে পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছি।

About Magura Times

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Translate »